
অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া,
শীত—প্রকৃতির এক নীরব অথচ নির্মম রূপ। সারা দেশে হঠাৎ করেই নেমে এসেছে তীব্র শীতপ্রবাহ। ঘন কুয়াশা, হিমেল বাতাস আর রাতের তাপমাত্রার অস্বাভাবিক পতনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। শহরের বহুতল ভবনের ভেতর বসবাসকারীরা হয়তো শীতের তীব্রতা কিছুটা সামাল দিতে পারছেন, কিন্তু দেশের প্রান্তিক মানুষ—খেটে খাওয়া শ্রমজীবী, পথশিশু, ছিন্নমূল মানুষ, বৃদ্ধ ও অসুস্থরা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর শীতকালে দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা ৫–৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে। এই সময়ে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে শীত একটি নীরব ঘাতক হয়ে ওঠে। হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে শীতজনিত রোগীর চাপ, অথচ গ্রামাঞ্চলে এখনও পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা ও শীতবস্ত্রের অভাব প্রকট।
শীত কেবল আবহাওয়ার বিষয় নয়—এটি একটি সামাজিক সংকট। একজন দিনমজুরের কাছে শীত মানে কাজ কমে যাওয়া, আয়ের পথ সংকুচিত হওয়া। একজন পথশিশুর কাছে শীত মানে খোলা আকাশের নিচে অনিরাপদ রাত। একজন বৃদ্ধের কাছে শীত মানে অসহায়তা ও মৃত্যুভয়। অথচ আমাদের সমাজে শীত মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগ এখনও পর্যাপ্ত নয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে বিপদ-আপদ মানুষের জন্য পরীক্ষা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন—
“তিনি মানুষকে পরীক্ষা করেন ভালো ও মন্দ দ্বারা।” (সূরা আল-আম্বিয়া : ৩৫)এই কঠিন সময়ে মানবিক দায়িত্বের পাশাপাশি আল্লাহর দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা অপরিহার্য। রাসুল (সা.) শীতের রাতে বিশেষ দোয়া করতেন এবং উম্মতকে দোয়া ও সহমর্মিতার শিক্ষা দিয়েছেন। শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা।
হাদিসে আছে—
“যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের কষ্ট লাঘব করে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কষ্ট লাঘব করবেন।” (সহিহ মুসলিম)
আজ প্রয়োজন ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—তিন স্তরেই কার্যকর উদ্যোগ। সরকারিভাবে শীতবস্ত্র বিতরণ আরও বিস্তৃত করা, স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ানো, বেসরকারি সংস্থা ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসা জরুরি। পাশাপাশি আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্তত একজন শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
এই দুর্যোগময় সময়ে আমরা মহান আল্লাহর দরবারে হাত তুলে প্রার্থনা করি—
হে আল্লাহ, তুমি শীতার্ত, অসহায় ও বিপন্ন মানুষদের রক্ষা করো।তাদের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করো।আমাদের অন্তরে দয়া, সহমর্মিতা ও মানবিকতা দান করো।
আমাদেরকে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার তৌফিক দাও। আমিন।শীত একদিন চলে যাবে, কিন্তু এই সময়ে আমরা মানুষ হিসেবে কী করলাম—সে প্রশ্ন ইতিহাস আমাদের কাছেই রেখে যাবে।
অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া
লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট
Reporter Name 




























