বাদশা সেকেন্দার ভুট্টো,
ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি:
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার রামডাঙ্গা মাঝিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর নির্মাণকাজ বাস্তবে অসম্পূর্ণ থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক শিক্ষা অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার (PEIMS)-এ শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণকাজের প্রকৃত অগ্রগতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য PEIMS সফটওয়্যারে আপলোড করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়, এলজিইডি, ডিমলা সূত্রে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (PEDP-4)-এর আওতায় টেন্ডার প্যাকেজ নম্বর e-Tender/PEDP-4/NLP/Dim/2022-23/W14-01710-এর মাধ্যমে রামডাঙ্গা মাঝিপাড়া ও মধ্য ছাতনাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর ও ফটক নির্মাণকাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার এইচএস এন্টারপ্রাইজ ২৬ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৯ টাকা চুক্তিমূল্যে কাজটির কার্যাদেশ পায়।
২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কার্যাদেশ প্রদান করা হয় এবং চুক্তি অনুযায়ী কাজ সমাপ্তির নির্ধারিত তারিখ ছিল ৮ আগস্ট ২০২৩। তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়েই বাস্তবে নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ থাকা সত্ত্বেও PEIMS সফটওয়্যারে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিল উত্তোলন করা হয়।
একই প্যাকেজের আওতায় মধ্য ছাতনাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাজ নিয়ে কোনো অভিযোগ না থাকলেও রামডাঙ্গা মাঝিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন নির্দেশনা অনুযায়ী নির্মাণকাজের অগ্রগতি পর্যায়ক্রমে PEIMS সফটওয়্যারে হালনাগাদ করার বিধান থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে কাজ অসম্পূর্ণ থাকা সত্ত্বেও সফটওয়্যারে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে চূড়ান্ত বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
যদিও প্রকল্পটির কাজ ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাস্তবায়িত হয়, সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে অভিযোগের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ায় এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সরকারি নথিতে নির্মাণকাজ শতভাগ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে সীমানা প্রাচীরের ওপর নির্ধারিত লোহার গ্রিল, মূল ফটকের স্টিলের গেট, বিদ্যালয়ের নাম, স্থাপনের সাল ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার নামসংবলিত স্টিলের সাইনেজ, প্রাচীরের একটি অংশ এবং পুরো প্রাচীরে রং করার কাজ এখনও বাকি রয়েছে। রং না করায় প্রাচীরের বিভিন্ন স্থানে শ্যাওলা জমেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আরসিসি ঢালাইয়ে নির্ধারিত মানের রডের পরিবর্তে নিম্নমানের রড, নিম্নমানের ইটের খোয়া এবং নির্ধারিত অনুপাতে কম সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া সীমানা প্রাচীর নির্মাণে তিন নম্বর মানের ভাঙাচোরা ও আদলা ইট ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় সময় ধরে কিউরিং না করায় নির্মাণকাজের স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণকাজ চলাকালে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল কর্মকর্তাদের কার্যকর তদারকির অভাব ছিল। নিয়মিত মান নিয়ন্ত্রণ ও পরিদর্শন নিশ্চিত না হওয়ায় নির্মাণকাজের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, নির্মাণকাজের অগ্রগতি সম্পর্কে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি (এসএমসি)-কে কোনো পর্যায়েই অবহিত করা হয়নি। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের অজান্তেই PEIMS সফটওয়্যারে নির্মাণকাজ শতভাগ সম্পন্ন দেখানো হয় এবং পরে ঠিকাদারের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিল উত্তোলন করা হয়।
বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে পাঁচজন শিক্ষক কর্মরত এবং শিক্ষার্থী ১৮৭ জন। মূল ফটক ও সীমানা প্রাচীরের অংশবিশেষ অসম্পূর্ণ থাকায় গবাদিপশু বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রবেশ করছে। এতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিক পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী বলেন, “কাজ চলাকালীন স্কুলের যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়েছে, তার বিলও ঠিকাদার পরিশোধ করেননি। কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারকে বারবার তাগাদা দিয়েছি। বিদ্যালয় থেকে কোনো কাজ সমাপ্তির প্রত্যয়নপত্র বা প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি। তারপরও কীভাবে চূড়ান্ত বিল দেওয়া হলো, তা আমাদের বোধগম্য নয়।”
বর্তমান উপজেলা প্রকৌশলী মোফিজুর রহমান বলেন, “বিষয়টি আমার দায়িত্ব গ্রহণের আগের। অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। অনিয়মের প্রমাণ মিললে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অসম্পূর্ণ কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।”
অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী শফিউর রহমান (বর্তমানে এলপিআর-এ), সার্ভেয়ার শাকিল হোসেন এবং হিসাবরক্ষক আসাদুজ্জামান মানিক-এর বিরুদ্ধে PEIMS সফটওয়্যারে নির্মাণকাজ শতভাগ সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ডিমলা অফিসে কর্মরত থাকায় তারা এ ধরনের অনিয়ম করতে সাহস পেয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এইচএস এন্টারপ্রাইজ-এর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন রিসিভ করা হয়নি।
অন্যদিকে, সাবেক উপজেলা প্রকৌশলী শফিউর রহমান বলেন, “আমি তখন কিডনি অপারেশনের কারণে অসুস্থ ছিলাম। সেই সময় কখন হিসাবরক্ষক বিলটি সই করিয়ে নিয়েছেন, আমি বুঝতে পারিনি।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সার্ভেয়ার শাকিল হোসেন বলেন, “ঠিকাদার আমাকে ব্ল্যাকমেইল করে বিলটি উত্তোলন করেছে। এখন কাজ সম্পন্ন করতে বললে বিভিন্ন তালবাহানা করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বাকি কাজ সম্পন্নের ব্যবস্থা করছি। ভবিষ্যতে আর এমন ভুল হবে না।”
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিদ্যালয়ের অসম্পূর্ণ নির্মাণকাজ দ্রুত সম্পন্ন করা হোক।
Reporter Name 























