দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে আজ আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদ সদস্যদের ভোটগ্রহণ হবে। ভোট শেষ হওয়ার পর একই স্থানে ফলাফল ঘোষণা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনি কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন।
এবার রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ক্ষমতাসীন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।
সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমান সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনসহ মোট সদস্য সংখ্যা ৩৪৯। একটি আসনের গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় ভোটের জন্য ৩৪৯টি ব্যালট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ভোটগ্রহণের জন্য সংসদকক্ষে থাকবে তিনটি ব্যালট বাক্স। তবে মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন বিএনপির সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস ভোট দিতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভোটগ্রহণ ও গণনা শেষে আজই ফলাফল ঘোষণা করা হবে। পরে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হবে। আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
দীর্ঘ বিরতির পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ায় এবারের ভোটকে ঐতিহাসিক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান বুধবার বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় বলেন, দীর্ঘ সংগ্রাম ও অনেক মূল্য দেওয়ার পর দেশের মানুষ আবার এমন একটি নির্বাচনের সুযোগ পেয়েছে।
সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ৩৫ বছর পর দেশের মানুষ আবারও ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করবে। তাঁর মতে, দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে।
সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিনও নির্বাচনটিকে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে বলেন, দীর্ঘ সময় পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ায় এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। দীর্ঘ বিরতির কারণে প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা সীমিত থাকলেও নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবরের পর গত সাতটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। এরপর আর কোনো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়নি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে শুধু সংসদ সদস্যরাই ভোট দিতে পারেন। ফলে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেই নিজের ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
অন্যদিকে সংসদ সদস্য না হওয়ায় তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী অলি আহমদ ভোট দিতে পারবেন না। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে।
বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একপর্যায়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
বক্তব্যে দলের প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, দলের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের কথা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, দায়িত্ব পালনের সময় কোনো ভুল হয়ে থাকলে কিংবা অজান্তে কারও মনে আঘাত দিয়ে থাকলে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী। দল তাঁকে যে দায়িত্ব ও সম্মান দিয়েছে, তা জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস না করার কথাও জানান মির্জা ফখরুল। বঙ্গভবনে দায়িত্ব নেওয়ার পর দলের সহকর্মীদের মিস করবেন উল্লেখ করে নেতাকর্মীদের কাছে দোয়া চান তিনি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন।
তিনি জানান, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও বিরোধীদলীয় নেতার ভোট দেওয়ার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। ভোট গণনার সময়ও সরাসরি সম্প্রচার চালু থাকবে।
তবে ফলাফল ঘোষণার সময় কোনো সংসদ সদস্য কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা প্রকাশ করা হবে না। ব্যালটে ভোটার ও প্রার্থীদের নাম থাকবে। ভোটগ্রহণের সময় সংসদকক্ষে কোনো ধরনের প্রচারণা চালানো যাবে না।
বাংলাদেশ টেলিভিশন ও সংসদ টেলিভিশনে ভোট গণনা থেকে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। ফলে ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া সরাসরি দেখার সুযোগ পাবেন দেশের মানুষ।
Reporter Name 






















